অক্ষাংশ কাকে বলে? অক্ষাংশ হলো পৃথিবীর একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূগোলিক পরিমাপ, যা পৃথিবীকে উত্তরের ও দক্ষিণের অংশে ভাগ করে। এটি পৃথিবীকে দুটি সমান্তরাল রেখায় (অক্ষাংশরেখা) বিভক্ত করে, যা পৃথিবীর পৃষ্ঠের ওপর স্থান নির্ধারণে ব্যবহৃত হয়। অক্ষাংশ শব্দটি এসেছে ল্যাটিন শব্দ “Latitude” থেকে, যার অর্থ বিস্তার বা প্রসার। এটি পৃথিবীর গোলাকৃতি বা গোলার্ধের চারপাশে শূন্যবিন্দু (Equator) থেকে উত্তরের বা দক্ষিণের দিকে মাপা হয়।
পৃথিবীর ভৌগলিক স্থান নির্ধারণে অপরিহার্য ভূমিকা পালন করে অক্ষাংশ , বিশেষ করে জিপিএস সিস্টেম বা মানচিত্রে অবস্থান চিহ্নিত করতে। উদাহরণস্বরূপ, যদি আপনি কোনো দেশ বা শহরের অক্ষাংশ জানতে চান, তবে সেটি সঠিকভাবে স্থান নির্ধারণে সহায়তা করবে।
এর ভূমিকা এতটাই গুরুত্বপূর্ণ যে, এটি নেভিগেশন, মানচিত্র এবং আবহাওয়া পর্যবেক্ষণে ব্যবহৃত হয়। সাধারণভাবে, পৃথিবীকে ১৮০টি অক্ষাংশরেখা দ্বারা ভাগ করা হয়, যা পৃথিবীকে উত্তর ও দক্ষিণ অক্ষাংশে ভাগ করে। তাই, পৃথিবীকে বুঝতে এবং বিভিন্ন স্থান চিহ্নিত করতে অক্ষাংশ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
অক্ষাংশের বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা (Scientific Explanation of Latitude)
এর বৈজ্ঞানিক সংজ্ঞা হলো পৃথিবীকে ইকুয়েটর থেকে উত্তরে বা দক্ষিণে ডিগ্রি হিসেবে মাপা। এই পরিমাপ ০° থেকে ৯০° পর্যন্ত হয়ে থাকে। ইকুয়েটর বা প্রধান অক্ষাংশ ০°-এ অবস্থিত এবং এটি পৃথিবীকে উত্তর ও দক্ষিণ অক্ষাংশে ভাগ করে। এরপর, উত্তর মেরু (North Pole) থেকে ৯০° উত্তর এবং দক্ষিণ মেরু (South Pole) থেকে ৯০° দক্ষিণে অক্ষাংশরেখা বিস্তৃত হয়।
পৃথিবীর সঠিক স্থান নির্ধারণে খুবই গুরুত্বপূর্ণ অক্ষাংশের পরিমাপ। এটি মূলত ভৌগলিক কো-অর্ডিনেট সিস্টেমের অংশ, যেখানে দ্রাঘিমাংশ (Longitude) এবং অক্ষাংশ একে অপরের পরিপূরক। উদাহরণস্বরূপ, গ্রেট ব্রিটেনের লন্ডন শহরটির অবস্থান ৫১.5074° N (North Latitude) এবং ০.1278° W (West Longitude)।
এছাড়া, অক্ষাংশের বিভিন্ন প্রকারও রয়েছে:
- Equator (০° Lat)
- Tropic of Cancer (২৩.৫° N)
- Tropic of Capricorn (২৩.৫° S)
- Arctic Circle (৬৬.৫° N)
- Antarctic Circle (৬৬.৫° S)
এই পরিমাপের মাধ্যমে আমরা পৃথিবীর বৈজ্ঞানিক কাঠামো বুঝতে পারি এবং এটি আমাদের অবস্থান সঠিকভাবে নির্ধারণ করতে সহায়তা করে।
অক্ষাংশের মাত্রা ও ধরন
এর পরিমাপ হয় ডিগ্রি ভিত্তিক, যা পৃথিবীকে উত্তরের ও দক্ষিণের দিকে ০° থেকে ৯০° পর্যন্ত বিভক্ত করে। শূন্যবিন্দু (Equator) থেকেই এ পরিমাপ শুরু হয়।
অক্ষাংশের ধরন বা শ্রেণী হলো:
- প্রধান অক্ষাংশ (Equator – 0°)
- Equator পৃথিবীর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অক্ষাংশ, কারণ এটি পৃথিবীকে দুই সমান অংশে ভাগ করে। এটি পৃথিবীকে উত্তর ও দক্ষিণ ভাগে আলাদা করে এবং পৃথিবীর সবচেয়ে গরম স্থান হিসেবে পরিচিত।
- উত্তর অক্ষাংশ (Northern Latitudes)
- ০° থেকে ৯০° উত্তর পর্যন্ত অক্ষাংশ অঞ্চল। এই অঞ্চলে অবস্থানকারী স্থানগুলো উত্তরের দিকে প্রসারিত হয়ে গ্রীষ্মকাল ও শীতকালীয় পরিবর্তন অনুভব করে। উদাহরণস্বরূপ, বাংলাদেশ এর অক্ষাংশ ২৩.৭১° N।
- দক্ষিণ অক্ষাংশ (Southern Latitudes)
- ০° থেকে ৯০° দক্ষিণ পর্যন্ত অক্ষাংশ। এটি পৃথিবীর দক্ষিণে অবস্থিত দেশগুলোর স্থান নির্ধারণে ব্যবহৃত হয়। উদাহরণস্বরূপ, আর্জেন্টিনা এর অক্ষাংশ ৩৮° S।
- ট্রপিক অফ ক্যান্সার ( ২৩.৫° N)
- এটি পৃথিবীর উত্তর গোলার্ধের একটি গুরুত্বপূর্ণ অক্ষাংশ। গ্রীষ্মকালীন সূর্যোদয়ের সময় সূর্য এই রেখা দিয়ে সরাসরি তাপ বিকিরণ করে।
- ট্রপিক অফ ক্যাপ্রিকর্ন (Tropic of Capricorn – ২৩.৫° S)
- এটি পৃথিবীর দক্ষিণ গোলার্ধের একটি গুরুত্বপূর্ণ অক্ষাংশ, যেখানে সূর্যের তাপ বিকিরণ শীতকালে সবচেয়ে বেশি অনুভূত হয়।
- আর্কটিক সার্কেল (Arctic Circle – ৬৬.৫° N)
- উত্তর গোলার্ধে অবস্থিত এই রেখাটি পোলার নাইট এবং পোলার ডে এর জন্য পরিচিত। এটি সেই স্থান যেখানে একদিনে ২৪ ঘণ্টার পুরোটা সূর্য থাকে বা থাকে না।
- অ্যান্টার্কটিক সার্কেল (Antarctic Circle – ৬৬.৫° S)
- পৃথিবীর দক্ষিণ গোলার্ধে অবস্থিত এই রেখাটি পৃথিবীর দক্ষিণ মেরুর কাছে এবং এখানেও পোলার নাইট এবং পোলার ডে অভিজ্ঞতা হয়।
আমাদের জীববৈচিত্র্য ও জলবায়ু সংক্রান্ত বৈচিত্র্য বোঝার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে অক্ষাংশের পরিমাপ। যেহেতু পৃথিবীর বিভিন্ন অংশে অক্ষাংশের তারতম্য রয়েছে, তাই ওই অঞ্চলের আবহাওয়া, তাপমাত্রা এবং ভূগোলও আলাদা হয়ে থাকে।
অক্ষাংশের গুরুত্ব (Importance of Latitude)
অক্ষাংশের গুরুত্ব পৃথিবীকে বুঝতে ও নির্দিষ্ট স্থান শনাক্ত করতে অপরিহার্য। এটি শুধু ভূগোল বা মানচিত্র তৈরিতেই ব্যবহৃত হয় না, বরং নেভিগেশন, আবহাওয়া এবং জলবায়ু পরিবর্তন বোঝার ক্ষেত্রেও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অক্ষাংশের মান অনুসারে পৃথিবীর তাপমাত্রা এবং ঋতুবৈচিত্র্য নির্ধারিত হয়, যা স্থানীয় আবহাওয়ার ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলে।
- নেভিগেশন ও মানচিত্র
পৃথিবীর যেকোনো স্থান বা দেশকে সঠিকভাবে চিহ্নিত করার জন্য অক্ষাংশ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। পৃথিবীজুড়ে বিভিন্ন স্থানের সঠিক অবস্থান জানাতে GPS সিস্টেম বা স্যাটেলাইট নেভিগেশন ব্যবহৃত হয়, যা অক্ষাংশ ও দ্রাঘিমাংশ সিস্টেমের উপর ভিত্তি করে কাজ করে। একটি শহরের সঠিক অবস্থান জানা হলে সে স্থানটির মানচিত্রও সহজেই তৈরি করা যায়। - আবহাওয়া ও জলবায়ু
পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চলের তাপমাত্রা, বৃষ্টি এবং তুষারপাত নির্ভর করে অক্ষাংশের অবস্থানের ওপর। উদাহরণস্বরূপ, পৃথিবীর ইকুয়েটর অঞ্চলে গরম এবং আর্দ্র আবহাওয়া বিরাজমান, কারণ এখানে সূর্যের রশ্মি প্রায় সমানভাবে পড়ে, যেটি গরম আবহাওয়ার সৃষ্টি করে। অন্যদিকে, আর্কটিক সার্কেল বা অ্যান্টার্কটিক সার্কেল অঞ্চলে খুবই ঠান্ডা এবং শুষ্ক আবহাওয়া থাকে। - ভূগোল ও জলবায়ু অঞ্চল
পৃথিবীকে বিভিন্ন জলবায়ু অঞ্চলে ভাগ করা হয়েছে এবং এটি মূলত অক্ষাংশের ভিত্তিতেই নির্ধারিত। জলবায়ু অঞ্চলগুলি যেমন গ্রীষ্মমন্ডলীয়, মৃদু, শীতল এবং মেরু অঞ্চল এসবের মধ্যে পার্থক্য মূলত অক্ষাংশের ভিত্তিতে হয়। যেমন, ট্রপিক অফ ক্যান্সার এবং ট্রপিক অফ ক্যাপ্রিকর্ন অঞ্চলে ভিন্ন ধরনের গ্রীষ্মকালীন এবং শীতকালীন পরিবর্তন দেখা যায়।
অক্ষাংশের ব্যবহার (Applications of Latitude)
অক্ষাংশের ব্যবহার আমাদের দৈনন্দিন জীবনে নানা ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এর মাধ্যমে নেভিগেশন, জলবায়ু অনুসন্ধান এবং বিশ্ব মানচিত্র তৈরি সম্ভব। নিচে অক্ষাংশের কিছু গুরুত্বপূর্ণ ব্যবহার তুলে ধরা হলো:
- নেভিগেশন এবং রুট প্ল্যানিং
বিমান চলাচল, জাহাজ চলাচল এবং স্থলপথের সঠিক রুট নির্ধারণে অক্ষাংশ ব্যবহৃত হয়। উদাহরণস্বরূপ, বিমানের উত্তর-পূর্ব রুট অথবা জাহাজের উত্তর-পশ্চিম রুট চিহ্নিত করতে অক্ষাংশ সহ দ্রাঘিমাংশের সাহায্যে সঠিক রুট নির্ধারণ করা হয়। - অক্ষাংশ এবং জিপিএস
GPS প্রযুক্তির মাধ্যমে পৃথিবীর যেকোনো স্থান দ্রুত এবং সঠিকভাবে নির্ধারণ করা সম্ভব হয়। এর জন্য অক্ষাংশ এবং দ্রাঘিমাংশের সঠিক তথ্য প্রয়োজন। আপনি যদি একটি নির্দিষ্ট জায়গায় পৌঁছানোর চেষ্টা করেন, তবে অক্ষাংশ ও দ্রাঘিমাংশ মিলে আপনার গন্তব্য স্থানটি নির্ধারণ করে দেয়। - আবহাওয়ার পূর্বাভাস
অক্ষাংশের তথ্য দিয়ে আবহাওয়ার পূর্বাভাস এবং জলবায়ু গবেষণা করা হয়। ভূ-গোলার বিভিন্ন অক্ষাংশের ওপর ভিত্তি করে আবহাওয়াবিদরা জানতে পারেন, কোন এলাকায় বৃষ্টি, তাপ, অথবা শীতলতা কেমন হবে। এভাবেই সঠিক পূর্বাভাস দেওয়া সম্ভব হয়। উদাহরণস্বরূপ, যেমন ভারতের দক্ষিণাঞ্চল বা আফ্রিকা গ্রীষ্মমন্ডলীয় অঞ্চলের অন্তর্গত হওয়ায় সেখানে উচ্চ তাপমাত্রা ও আর্দ্রতা বিরাজমান। - মানচিত্র এবং গ্লোব
পৃথিবীর মানচিত্র বা গ্লোব তৈরিতে অক্ষাংশের ব্যবহার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। মানচিত্রে প্রত্যেকটি স্থানের সঠিক অবস্থান জানাতে এবং তাদের মধ্যে দূরত্ব নির্ধারণে অক্ষাংশের ভূমিকা অপরিসীম।
অক্ষাংশের সাথে সম্পর্কিত অন্যান্য ভূগোলীয় পরিমাপ (Other Geographical Measurements Related to Latitude)
অক্ষাংশের সাথে একে অপরকে সম্পূরক ভূগোলীয় পরিমাপ হিসেবে দ্রাঘিমাংশ (Longitude) এবং উচ্চতা (Altitude) ব্যবহৃত হয়। নিচে এদের সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করা হলো:
- দ্রাঘিমাংশ (Longitude)
দ্রাঘিমাংশ পৃথিবীকে পূর্ব ও পশ্চিমে ভাগ করে এবং এটি অক্ষাংশের সাথে মিলিয়ে পৃথিবীর সঠিক স্থান চিহ্নিত করে। গ্রেট ব্রিটেনের লন্ডন শহরটি ইস্ট বা ওয়েস্ট দ্রাঘিমাংশ দ্বারা চিহ্নিত করা হয়, যেখানে দ্রাঘিমাংশের মান ০° (প্রধান দ্রাঘিমাংশ)। - উচ্চতা (Altitude)
উচ্চতা বা ইলেভেশন পৃথিবীর যে কোনো স্থান থেকে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা নির্দেশ করে। যদিও এটি অক্ষাংশের সাথে সরাসরি সম্পর্কিত নয়, তবে স্থানটির আবহাওয়া এবং জলবায়ু পরিস্থিতি নির্ধারণে সহায়ক। উচ্চতাও স্থান নির্ধারণে সহায়ক হতে পারে যখন আপনি কোনো নির্দিষ্ট অঞ্চল বা শহরের আবহাওয়া সম্পর্কে জানতে চান। - ভূ-রেখা (Meridians)
ভূ-রেখা বা দ্রাঘিমাংশ রেখা পৃথিবীকে পূর্ব ও পশ্চিমে ভাগ করে। এর মাধ্যমে পৃথিবীর সঠিক অবস্থান চিহ্নিত করা যায় এবং এটি অক্ষাংশের সাথে মিলে একত্রে পৃথিবীজুড়ে ভৌগলিক কো-অর্ডিনেট সিস্টেম তৈরি করে।
অক্ষাংশের উপর ভিত্তি করে পৃথিবীর আবহাওয়া অঞ্চল (Climate Zones Based on Latitude)
অক্ষাংশের মাধ্যমে পৃথিবীকে বিভিন্ন আবহাওয়া অঞ্চলে ভাগ করা হয়। পৃথিবীর গঠন এবং সূর্যের রশ্মি নির্ভর করে প্রত্যেক অঞ্চলের তাপমাত্রা এবং জলবায়ু। এখানে কিছু গুরুত্বপূর্ণ আবহাওয়া অঞ্চল আলোচনা করা হলো:
- গ্রীষ্মমন্ডলীয় অঞ্চল (Tropical Zones)
- ইকুয়েটরের কাছাকাছি অঞ্চলে অক্ষাংশের মান ০° থেকে ২৩.৫° উত্তর বা দক্ষিণ পর্যন্ত হয়ে থাকে। এ অঞ্চলে সূর্যের রশ্মি সরাসরি পড়ে, ফলে গরম এবং আর্দ্র আবহাওয়া থাকে। উদাহরণস্বরূপ, ভারত, আফ্রিকা, ব্রাজিল ও ইন্দোনেশিয়া। এ অঞ্চলে দুইটি মৌসুম— বর্ষা এবং গ্রীষ্মকাল—এমন ধরনের আবহাওয়া থাকে।
- মৃদু অঞ্চল (Temperate Zones)
- ২৩.৫° থেকে ৬৬.৫° উত্তরে এবং ২৩.৫° থেকে ৬৬.৫° দক্ষিণে এই অঞ্চলে অক্ষাংশের মান থাকে। এখানে গরম এবং ঠান্ডা উভয় ধরনের আবহাওয়া থাকে। উত্তর গোলার্ধের মৃদু অঞ্চলের মধ্যে রয়েছে উত্তর আমেরিকা, ইউরোপ এবং এশিয়ার বেশ কিছু অংশ, যেখানে ঋতু পরিবর্তন যথেষ্ট প্রকট।
- শীতল অঞ্চল (Polar Zones)
- ৬৬.৫° উত্তর ও দক্ষিণে অবস্থিত অঞ্চলগুলি, যেমন আর্কটিক ও অ্যান্টার্কটিক, এখানে ঠান্ডা এবং শুষ্ক আবহাওয়া থাকে। এ অঞ্চলে পোলার নাইট এবং পোলার ডে দেখা যায়, যেখানে দিনের সময় সূর্য স্থির থাকে বা একেবারেই দেখা যায় না।
অক্ষাংশের উপর ভিত্তি করে এই ধরনের আবহাওয়া অঞ্চলগুলি পৃথিবীর বৈচিত্র্য এবং জলবায়ু গবেষণায় খুবই গুরুত্বপূর্ণ। বিজ্ঞানীরা এই অঞ্চলগুলোকে বুঝে বিভিন্ন পরিবেশগত পরিকল্পনা করেন।
অক্ষাংশের হিসাব কিভাবে করা হয়? (How is Latitude Measured?)
অক্ষাংশের পরিমাপ সাধারণত ডিগ্রি আকারে করা হয় এবং এটি ইকুয়েটর (০°) থেকে শুরু হয়ে উত্তর মেরু (৯০° N) এবং দক্ষিণ মেরু (৯০° S) পর্যন্ত বিস্তৃত। অক্ষাংশের পরিমাপের জন্য বিভিন্ন প্রযুক্তি ও যন্ত্র ব্যবহার করা হয়। কয়েকটি সাধারণ পদ্ধতি হলো:
- নেভিগেশনাল যন্ত্রপাতি
প্রাচীন কালে, সমুদ্রযাত্রীরা অক্ষাংশ নির্ধারণ করতে অ্যালটিটিউড ডিভাইস ব্যবহার করতেন। আধুনিক প্রযুক্তির মাধ্যমে GPS এবং স্যাটেলাইট সিস্টেম ব্যবহার করে স্থান নির্ধারণ করা হয়। - গণনা পদ্ধতি
অক্ষাংশ পরিমাপের একটি পুরনো পদ্ধতি ছিল সূর্যের অবস্থান থেকে নির্ধারণ করা। উদাহরণস্বরূপ, দুপুর বেলা সূর্য কতটা উঁচু বা নিচু, তার ভিত্তিতে অক্ষাংশ নির্ধারণ করা হত। - অ্যাল্টিটিউড ডিভাইস এবং জিপিএস সিস্টেম
আধুনিক সময়ে জিপিএস সিস্টেম অক্ষাংশ নির্ধারণের জন্য সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য এবং দ্রুততম পদ্ধতি। পৃথিবীর যেকোনো স্থান সহজেই সঠিকভাবে চিহ্নিত করা যায় এই প্রযুক্তির মাধ্যমে।
অক্ষাংশ এবং পৃথিবীর স্থিতি (Latitude and Earth’s Position)
অক্ষাংশ শুধুমাত্র স্থান নির্ধারণের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ নয়, এটি পৃথিবীর অবস্থান এবং সূর্যরশ্মির প্রভাবে বিভিন্ন অঞ্চলে তাপমাত্রার তারতম্য বুঝতে সাহায্য করে। পৃথিবীকে যখন অক্ষাংশ অনুযায়ী বিশ্লেষণ করা হয়, তখন বুঝতে সুবিধা হয়:
- প্রধান অক্ষাংশ (Equator)
০° Lat পৃথিবীর শূন্যবিন্দু (Equator) থেকে পৃথিবীকে দুই সমান অংশে ভাগ করা হয়। এখানে সূর্যের রশ্মি সর্বাধিক শক্তিশালী হওয়ায় গরম আবহাওয়া সৃষ্টি হয়। - ট্রপিক অফ ক্যান্সার এবং ট্রপিক অফ ক্যাপ্রিকর্ন
এই দুটি রেখা ২৩.৫° উত্তরে এবং ২৩.৫° দক্ষিণে অবস্থিত। এখানে সূর্য সবচেয়ে বেশি প্রভাব ফেলে এবং গ্রীষ্মকাল প্রাধান্য পায়। - আর্কটিক সার্কেল এবং অ্যান্টার্কটিক সার্কেল
এই দুটি রেখা পৃথিবীর মেরু অঞ্চলের কাছে অবস্থিত, যেখানে পোলার নাইট এবং পোলার ডে দেখা যায়।
এই সকল রেখা পৃথিবীর স্থিতি এবং আবহাওয়া সম্পর্কে আমাদের জানতে সাহায্য করে।
আরও জানুনঃ কর্কটক্রান্তি রেখা কাকে বলে? পৃথিবীর ভৌগোলিক অবস্থানের এক চমৎকার ব্যাখ্যা
উপসংহার (Conclusion)
অক্ষাংশ পৃথিবীকে বুঝতে এবং স্থান নির্ধারণে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি পরিমাপ। এটি কেবল নেভিগেশন বা মানচিত্র তৈরি করতে সহায়ক নয়, বরং আবহাওয়া, জলবায়ু, এবং পৃথিবীর স্থিতি সম্পর্কেও গুরুত্বপূর্ণ তথ্য প্রদান করে। অক্ষাংশের ব্যবহার এবং তার গুরুত্ব কখনোই অগ্রাহ্য করা যায় না, কারণ এটি নির্ভুল স্থানচিহ্ন, ঋতুবৈচিত্র্য, এবং ভূগোল বুঝতে সহায়ক হয়।
এছাড়া, আধুনিক প্রযুক্তি যেমন জিপিএস ও স্যাটেলাইট সিস্টেম এর মাধ্যমে আমরা এখন খুব সহজে পৃথিবীর যেকোনো স্থান সঠিকভাবে চিহ্নিত করতে পারি, যার জন্য অক্ষাংশ অত্যন্ত প্রয়োজনীয়। এই সমস্ত তথ্য আমাদের পৃথিবী এবং তার জলবায়ু, আবহাওয়া এবং পরিবেশ সম্পর্কে আরও গভীরভাবে বুঝতে সহায়তা করে।
অক্ষাংশ কাকে বলে – FAQ
1. অক্ষাংশ কাকে বলে?
অক্ষাংশ হলো পৃথিবীকে উত্তরের ও দক্ষিণের দিকে ভাগ করা রেখা, যা পৃথিবীকে সমান্তরালভাবে বিভক্ত করে।
2. অক্ষাংশের পরিমাপ কীভাবে করা হয়?
অক্ষাংশ ০° থেকে ৯০° পর্যন্ত ডিগ্রি দিয়ে পরিমাপ করা হয়, যেখানে ইকুয়েটর ০°।
3. অক্ষাংশ কেন গুরুত্বপূর্ণ?
অক্ষাংশ স্থান নির্ধারণ, আবহাওয়া, এবং মানচিত্র তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
4. অক্ষাংশ ও দ্রাঘিমাংশের মধ্যে পার্থক্য কী?
অক্ষাংশ উত্তরের ও দক্ষিণের দিকে পরিমাপ করা হয়, দ্রাঘিমাংশ পূর্ব ও পশ্চিমের দিকে।
5. অক্ষাংশের কোন কোন অঞ্চল রয়েছে?
গ্রীষ্মমন্ডলীয়, মৃদু এবং শীতল অঞ্চলগুলি অক্ষাংশের ভিত্তিতে নির্ধারিত।
অক্ষাংশ কাকে বলে? যদি এই বিষয়ে আপনার কোনো প্রশ্ন থাকে, তাহলে অনুগ্রহ করে নিচে মন্তব্য করুন। পোস্টটি যদি তথ্যবহুল মনে হয়, তবে এটি আপনার বন্ধুদের সঙ্গে শেয়ার করতে পারেন। ধন্যবাদ!